কিছু অ-ধর্মীয় কথা (আমাকে নাস্তিকও বলতে পারেন!)

Bangladeshi Mikeছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে ‘সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার’ কথাটি অনেকবার পড়েছি। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার বলতে যা বোঝায় আমার পরিবারও তা-ই। নিজে সাচ্চা মুসলিম হতে পারি নি সত্য, তবে আমি নাস্তিক নই। কিন্তু আমি যা নিয়ে কথা বলবো, তা শুনে কেউ কেউ আমাকে নাস্তিক কিংবা মুরতাদ বলতেই পারেন। যদিও আমি নব্য ‘বলগার’ হয়ে যাওয়া টাইপের নাস্তিক্যবাদী কথাবার্তা লিখতে জানি না। ছোট্ট দু্টো কথা বলার জন্যই গভীর রাতে লিখতে বসা।

এসব এখন আবার বলতে গেলে কেউ কেউ বরিশাইল্যা ভাষায় গালি দিয়া বলতেই পারে, ‘ব্যাডা তুই ইউরোপ যাইয়া উদার হইছো?’। আসলে উদার-অনুদারের বিষয় না। আমি ধর্মের নামে যে-কোনো ধরনের অসুবিধারই বিপক্ষে। যেমন শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য আপনি কোনোভাবেই রাস্তা বন্ধ করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে তা হরহামেশাই করা হয়। সেই রাস্তা তো সবার। হিন্দুর, খ্রিস্টানের, মহিলার, বৃদ্ধার। একটা রাস্তা বন্ধ করতে হলে নিদেনপক্ষে ছোট্ট দুইটা রাস্তার ব্যবস্থা করার নামই আমার কাছে ‘ধর্ম’।

ওয়াজের নামে গভীররাত পর্যন্ত আপনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে পারেন না। অন্যের ঘুম মাটি করতে পারেন না। এই তো কিছুক্ষণ আগের কথা। বাসার পাশেই মসজিদ। সেখানে সন্ধ্যার পর থেকে ওয়াজ হচ্ছে। স্কাইপে কথা বলার সময় আমার কানই যেন ফেটে যাবার যোগাড়। আর পাঁচ বছরের বাচ্চা জিজ্ঞেস করলো তার মাকে — আচ্ছা আম্মু ওই লোকটা এভাবে চিল্লাচ্ছে কেন? তার মা বললো, বাবা হুজুর ওয়াজ করতেছে। জবাবে ছেলে বললো, কিন্তু এভাবে চিল্লাচিল্লির নামই কি ওয়াজ আম্মু? তার মা কোনো জবাব দিতে পারে না। ওয়াজের চোটে ছেলেরও ঘুম আসে না। আমার বৌয়ের মাথা ধরেছে। কিন্তু মধ্যরাত হয়ে গেলেও ওয়াজ বন্ধের কোনো ইশারা নেই।

আমার প্রশ্ন, যারা ওয়াজ শুনে সওয়াব কামাই করার তারা তো মসজিদে বা ওয়াজস্থলে গেছেই। তাহলে আবার বিশাল মাইক লাগিয়ে হুজুরের দাপুটে গলায় জনগণকে ওয়াজ শোনানোর কী আছে? আমি না হয় মুসলমান, কষ্ট করে, ধৈর্য ধরে আপনাদের ‘ওয়াজ’ শুনলাম। কিন্তু এই সমাজটা তো সবার, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা নাস্তিক-আস্তিক — সবার! তাহলে অন্যদের অসুবিধা হতে পারে এমন অনুষ্ঠান আয়োজন কেন? আর আমিই বা কেন শুনবো? আমার এই কথা শুনতে হলে বর্তমান যুগে হাজারও মাধ্যম আছে শুনতে পারার। আমি তো বলি নি আমার কানের কাছে মাইক লাগিয়ে দিতে। আমার ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর জন্য যদি হুজুরের ওয়াজ না শুনি আর আমার ধর্ম চলে যায় তবে চলে যাক। আমি অ-ধর্ম নিয়েই বেঁচে থাকবো। আমার বৌয়ের মাথার দাম আমার কাছে অনেক। হুজুরের ওয়াজের চেয়ে তার মাথার যন্ত্রণা নিরোধ আমার কাছে বড় ফরজ বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এতেও যদি আমার ধর্ম চলে যায় তবে চলে যাক।

কিছুদিন আগে এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের শহরের তিনজন বাংলাদেশির সঙ্গে। তারা তিনজনই উদার। কিন্তু কেউই আমার মতের সঙ্গে একমত হলেন না। আমি বললাম, এখন আর কেউ আজান শুনে মসজিদে যায় না। যারা নামাজ পড়েন তারা জানেন কয়টার নামাজ কয়টায়। তাহলে ঢাকা শহরে এক সঙ্গে লাখো মসজিদে আজান দেওয়ার দরকার কী? যেহেতু পাশাপাশি দুটো মসজিদ তাহলে সেই দুটোর একটিতে দিলেও তো চলে! শব্দদূষণ বলেও তো একটা কথা আছে। আর এক লাখ মসজিদে একসঙ্গে আজান দিতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বা ব্যাটারি খরচ হয় তাও তো এক ধরনের অপচয়। ইসলাম তো অপচয় সমর্থন করে না। (তাই বলে কিন্তু আমি আজানের বিপক্ষে নই)। অনেক আজান শুনতে খালি ইচ্ছেই করে। কিন্তু মালিবাগে আমার বাসার পাশের মসজিদের আজান শুনলে রাগে গা জ্বলে।

একটা সময় যখন মানুষের ঘড়ি ছিল না, প্রযুক্তির এতো ছড়াছড়ি ছিল না তখন আজান ছিল অন্যতম ভরসা। আমার মনে আছে, এই বছর পঁচিশেক আগেও মানুষ ইফতার করতো মসজিদের আজান শুনে। অনেক দূরের মসজিদের আজান সবার বাড়ি পৌঁছুতো না। আমাদের বাড়িতে একটা রেডিও ছিল। আমরা রেডিওর আজান শুনে ঘণ্টি দিয়ে বেল বাড়ি দিতাম। মানুষ ইফতার করতো। কিন্তু এখন একটি খুব ছোট্ট মোবাইল-অ্যাপই আপনাকে জানিয়ে দেবে ইফতারের সময়। তাই এতো ঘটা করে আর আগের মতো আজান না দিলেও চলে। এখন অনেক মসজিদে হুজুর ইফতার করার পরও আজান দিতে দেখেছি।

যা-ই হোক, ওই তিন ভাই আমাকে পেয়ে বসলেন। বললেন, আপনার মতো মুসলমানের জন্যই আজ ধর্মের আজ ১৩টা বাজছে। এই খ্রিস্টান-দেশে গীর্জায় যে ঘণ্টি বাজে সেটা কি আপনার মধুর লাগে? আমি বললাম, না, কোনোভাবেই লাগে না। বিন্দু পরিমাণও ভালো লাগে না। আমি এটারও ঘোর বিরোধী। আমি চাই, ধর্মের নামে কোনো একটা পিঁপড়ারও যেন চুল পরিমাণ ক্ষতি না হোক, মানুষ তো দূরের কথা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *